সংক্ষিপ্ত জীবনী
আল—জামিয়া আল—ইসলামিয়া পটিয়া—এটি শুধু একটি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; বরং এটি এক দীপ্তিমান জ্যোতিষ্ক, এক সোনালি ঐতিহ্যের নাম, এক আধ্যাত্মিক বাতিঘর—যা যুগে যুগে দীনি ইলম, রূহানিয়াত ও আমল—আখলাকের উজ্জ্বল প্রদীপ প্রজ্বলিত করেছে অসংখ্য হৃদয়ে।
এটি এক জীবন্ত কিংবদন্তি—যেখানে ইলম ও তাজকিয়ার সুশৃঙ্খল সাধনা, তাকওয়া ও ইখলাসের পবিত্র দীক্ষা, এবং ইসলামের আসমানী সৌন্দর্যের অফুরন্ত বিকাশ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সযত্নে লালিত ও সংরক্ষিত হয়ে আসছে।
যুগে যুগে, কালের ক্যানভাসে—এই মহিমান্বিত প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বভার যাঁরা বহন করেছেন, তাঁরা শুধু ব্যক্তি ছিলেন না; ছিলেন দীপ্ত দীপশিখা, ছিলেন আসমানী আহ্বানের নিরবিচল বাহক। কেউ ছিলেন কুতুবে যামান, কেউ শায়খুল আবর ওয়াল আ‘জম, কেউ মুফাক্কিরে ইসলাম, কেউ বা হাদিয়ে যামান—কিন্তু সকলের হৃদয়ে জ্বলেছে একই দীপ্ত শিখা: আল্লাহর ভালোবাসা, রাসূলের সুন্নাহর প্রতি অকৃত্রিম আনুগত্য, আর উম্মতের কল্যাণে আত্মবিসর্জনের অনিঃশেষ আগুন।
আল্লামা শাহ মুফতি আজিজুল হক (রহ.), আল্লামা হাজী ইউনুছ (রহ.), আল্লামা হারুন ইসলামাবাদী (রহ.), আল্লামা নূরুল ইসলাম কাদিম (রহ.), আল্লামা মুফতি আব্দুল হালিম বোখারী (রহ.)—তাঁরা ছিলেন সেইসব রূহানী মহীরুহ, যাঁদের শেকড় প্রোথিত ছিল কুরআন—সুন্নাহর গভীরতম মাটিতে। তাঁদের জ্ঞানের শাখা—প্রশাখা বিস্তৃত হয়ে ছায়া দিত উম্মতের দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে, শীতল করত দীনদারদের আত্মা, আর আলো ছড়াত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।
তাঁদের তাকওয়া ছিল সুবাসিত চন্দনের মতো, পরহেজগারি ছিল নির্মল ফোয়ারার ধারা। আমানতের ভার তাঁদের কাঁধে ছিল ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে, আর ইখলাস দীপ্ত অগ্নিশিখার মতো প্রজ্জ্বলিত। তাঁরা ছিলেন আলোকবর্তিকা—পথহারানো সময়ের দিকদ্রষ্টা, নির্জন দ্বীনের বাগিচায় সূর্যের আলো। তাঁদের মুজাহাদা উৎসারিত হতো অন্তরের আরশ থেকে, আর তাঁদের কোরবানি ছিল রাতের আঁধারে কান্না—ভেজা সিজদার গভীর নীরবতা। এই পবিত্র মেহনতেরই সুফলা ফসল—আল—জামিয়া আল—ইসলামিয়া পটিয়া। আজও এটি দীপ্ত, জ্যোতির্ময়, গৌরবের মিনার উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব দরবারে; আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে নিরবধি, অফুরান।
এ দীপ্তি নিভবে না, এ শিখা ঝিমোবে না। যুগান্তরের ধারাবাহিকতায়, মনোনীত মুখলেস রাহবারদের হাতে এ প্রতিষ্ঠান এগিয়ে যাবে অনন্ত অভিযাত্রায়—যেখানে গন্তব্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি, আর সঙ্গী হবে এক অবিনাশী সচ্চরিত্র ধারা।
জামিয়ার ইতিহাসের এমন এক সন্ধিক্ষণে—যখন বাতাস ভারী ছিল সংশয় ও অনিশ্চয়তার ছায়ায়, যখন প্রতিষ্ঠান প্রলয়ংকর ঝড়ের দ্বারপ্রান্তে, আর আস্থার কাঠামো ভঙ্গুর ও টলোমলো—ঠিক তখনই, নিজেকে আড়ালে রাখার শত ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর, তিনি আবির্ভূত হন এক দূরদর্শী নাবিকেরূপে। সদ্য ঝড় পেরোনো এক তরণীর হাল তিনি দৃঢ় হাতে ধারণ করেন; অস্পষ্ট দিগন্তে স্থির দৃষ্টি রেখে তাঁর মেহনত, প্রজ্ঞা ও ত্যাগে ক্রমে উন্মোচিত হয় আশাবাদের নতুন দিগন্ত।
তাঁর পদায়ন যেন এক আশার সূর্যোদয়—যার আলোয় গাঢ়তম ছায়াও পশ্চাদপসরণ করেছে। তিনি কেবল প্রতিষ্ঠানের রক্ষক নন, বরং এর আত্মিক পুনর্জাগরণের কাণ্ডারি। নেতৃত্বকে তিনি রূপান্তরিত করেছেন ইবাদতে, প্রশাসনকে পরিণত করেছেন খেদমতে, আর ইখলাসকে বানিয়েছেন পথচলার মূল পাথেয়।
আকাবিরদের রেখে যাওয়া দীনি ঐতিহ্যকে হৃদয়ের গভীরে ধারণ করে তিনি ভবিষ্যতের প্রতিটি পদক্ষেপ রেখেছেন সেই মহান পূর্বসূরিদের দৃষ্টিপথে—যেখানে সত্য, আমানত, তাওয়াক্কুল ও তাকওয়া মিলিত হয়ে গড়ে তুলেছে এক অটল আধ্যাত্মিক দুর্গ। আজ জামিয়া তার হৃদয়ে তাঁর নেতৃত্বের উষ্ণতা অনুভব করে, তাঁর দূরদর্শিতায় খুঁজে পায় নির্ভরতার আশ্বাস, আর তাঁর মুখলেস মেহনত ও আমানতদার চরিত্রে দেখতে পায় আকাবিরদের উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।
তাঁর জন্ম ও শৈশব
মুফতি আবু তাহের কাসেমী নদভী দা.বা. ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলার উত্তর নিচিন্তাপুর গ্রামের এক ধর্মনিষ্ঠ ও সম্মানিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম নজির আহমদ ছিলেন পরহেজগার, সৎ ও দীননিষ্ঠ একজন সাধারণ মানুষ, যিনি আচার—আচরণে ছিলেন অনুকরণীয় এবং পরিবারে ইসলামী পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় সদা সচেষ্ট।
প্রাথমিক শিক্ষা
শৈশবে তিনি পারিবারিক পরিবেশেই দ্বীনি শিক্ষার সূচনা করেন। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষাগুরু ছিলেন মাওলানা ক্বারি হারুন সাহেব যিনি তাঁকে কুরআন তিলাওয়াত ও মৌলিক দীনী শিক্ষায় দীক্ষিত করেন। পরে তাঁরই তত্ত্বাবধানে ভর্তি হন স্থানীয় জামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুর মাদরাসায়, যেখানে এক বছর অধ্যয়ন করেন। এরপর চার বছর জামিয়া কোরআনিয়া চন্দ্রঘোনা, চট্টগ্রাম মাদরাসায় অধ্যয়ন করেন। অতঃপর তিনি পুণ: ভর্তি হন জামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুরে এবং তিন বছর ধরে জামাতে চাহারুম পর্যন্ত শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
উচ্চতর শিক্ষা
পরবর্তীতে উচ্চতর দ্বীনি জ্ঞানার্জনের তীব্র তাগিদে তিনি গমন করেন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইলমি মারকায—আল—জামিয়া আল—ইসলামিয়া পটিয়া, চট্টগ্রাম। সেখানে ১৪০১ মোতাবেক ১৯৮০— দাওরায়ে হাদীস ১৪০২ হিজরি —১৯৮১ ইং. এবং ইফতা পড়েন । এ সময় তিনি অত্যন্ত শ্রম—সাধনা ও মুজাহাদার কারণে জামিয়ার মাশায়িখ ও উস্তাদদের স্নেহ ও সান্নিধ্যে ধন্য হন। বিশেষভাবে ফকীহুল মিল্লাত মুফতি আব্দুর রহমান (রহ.) তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। তাঁরই পরামর্শক্রমে তিনি ইফতা পড়ার জন্য পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথিমধ্যে দারুল উলুম দেওবন্দে যাত্রাবিরতি করেন। সে সময় বিশেষ কারণে দারুল উলুমের প্রখ্যাত শায়খুল হাদিস মাওলানা মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী (রহ.) সেখানে রমজানে বোখারী শরীফের দরস দিচ্ছিলেন। তাঁর দরস শুনে তিনি এতটাই মুগ্ধ হন যে, পুনরায় দারুল উলুম দেওবন্দে দাওরায়ে হাদিস পড়াতে মনস্থীর করেন এবং ১৪০৩ হি. মোতাবেক ১৯৮৪ সানে পুণ: দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করেন।
দাওরায়ে হাদীস সমাপ্তির পর আল্লামা সুলতান যওক নদভী রহ. এর পরামর্শে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আরবি সাহিত্যিক আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী (আলী মিয়া রহ.)—এর সোহবতে ভারতের লখনৌর প্রসিদ্ধ দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘নদওয়াতুল উলামা’—য় ভর্তি হন। সে সময় তিনি আলী মিয়া নদভী রহ. এর বিশেষ সোহবত লাভে ধন্য হন। এবং তিনি ১৪০৪ ও ১৪০৫ হি. দু’বছর আরবি ভাষা ও সাহিত্যের উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন এবং কৃতিত্বের সাথে তা সম্পন্ন করেন। বাংলাদেশীদের মধ্যে তিনি প্রথম ব্যক্তি যিনি নদওয়াতুল উলামা লক্ষনৌতে পড়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।
জামিয়ায় শিক্ষকতার সুচনা
দেশ—বিদেশের প্রখ্যাত মনিষীদের সান্নিধ্যে দীর্ঘদিন ইলম অর্জনের পর ১৪০৬ হিজরী (১৯৮৫ ইং.) তিনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) তাঁকে দেশে ফিরে আল্লামা সুলতান যওক নদভী রহ. এর সাথে দ্বীনি খেদমতে নিজেকে উৎসর্গ করার পরামর্শ দেন। পরে জামিয়ার উস্তাদগণের প্রস্তাবে ইস্তেখারা ও পরামর্শের পর এবছর—ই তিনি আল—জামিয়া আল—ইসলামিয়া পটিয়ায় যোগদান করেন।
যখন তিনি যোগ দেন, তখন মুহাররম মাস। খেদমতের ব্যবস্থা ঠিকঠাক করা হয়েছিল, তবে থাকার রুম বা বেতনের কোনও বন্দোবস্ত ছিল না। তিনি জামিয়ার মেহমানখানায় অবস্থান করতেন এবং নিয়মিত তাদরিসে ব্যস্ত থাকতেন। এভাবে কেটে গেল পুরো আট মাস। বেতনের জন্য কারো কাছে বলেননি; এমনকি অফিসেও কোন দিন যাননি। আগের মতোই মায়ের কাছ থেকে খরচ নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটাতেন। ধীরে ধীরে তাঁর তাকওয়া, ধৈর্য ও আন্তরিকতা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শুরু করে। পরবর্তীতে তাঁকে একসাথে দশ হাজার টাকা বেতন দেওয়া
হয়।
খতীবুল জামিয়া
জামিয়ায় নিয়োগ প্রাপ্তির পর কয়েক বছর পর ১৯৮৮ সাল থেকে হাজী সাহেব হুজুর রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাকে আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া–এর কেন্দ্রীয় শাহী জামে মসজিদে জুমা পড়ানোর দায়িত্ব প্রদান করেন। দায়িত্ব প্রাপ্ত হওয়ার পর থেকে প্রদত্ত খোতবা তাঁর জ্ঞানের গভীরতা ও আত্মিক প্রভাবের সাক্ষ্য বহন করে। তাঁর প্রতিটি খুতবা কোরআন ও হাদীসের অকাট্য দলিলনির্ভর, পূর্বপ্রস্তুতিসম্পন্ন এবং অন্তরের দরদে পূর্ণ। খতীবুল জামিয়া মুফতি আবু তাহের কাসেমী নদভী হাফিজাহুল্লাহ দারুল উলুম দেওবন্দের রূহানী ফয়েযপ্রাপ্ত এবং নদওয়াতুল উলামার আদবী যওকে ধন্য। ফলে তাঁর বক্তব্যে সালাফের আধ্যাত্মিকতা ও খলফের আধুনিকতার এক অনন্য সংমিশ্রণ প্রতিফলিত হয়।
বিশেষ করে তাঁর খুতবাগুলোতে হাকীমুল উম্মত হযরত আশরাফ আলী থানবী রহ. এর খুতুবাত ও মালফুযাত-এর সারনির্যাস এবং সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. এর আরবি সাহিত্যের রস প্রবাহিত। নিয়োগ প্রাপ্তির পর থেকে অদ্যাবধি তিনি এ দায়িত্ব পালন করছেন।
দারুল ইকামার তত্ত্বাবধায়ক
তাকওয়া ও আনুগত্যে আলোকোজ্জ্বল এক শিক্ষক একসময় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। তাঁর আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও স্থির মনোভাব প্রত্যক্ষ করে ১৯৯৭ ইং. সনে তাঁকে দারুল ইকামা নাজেম নিযুক্ত করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি ছাত্রদের আমল, আখলাক ও সার্বিক তরবিয়তে দৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল, প্রতিটি শিক্ষার্থী কেবল ইলম অর্জনে নয়, বরং জীবনচর্চার প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামী শৃঙ্খলা মেনে চলতে অভ্যস্ত হোক।
তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও অনুপম দিকনির্দেশনায় দারুল ইকামায় এমন পরিবেশ গড়ে ওঠে, যেখানে সকল ছাত্র মসজিদে গিয়ে বাজামাত নামাজ আদায় করত এবং কোন ছাত্র মসবুক হত না। তাঁর মেহনত ও তৎপরতায় জামিয়া পটিয়ার ছাত্ররা শৃঙ্খলা, নিয়মমাফিক জীবনধারা এবং আমল—আখলাকের দৃঢ় চর্চায় হয়ে ওঠে আদর্শিক প্রতিচ্ছবি।
১৯৯৭ ইং. সন থেকে ২০২২ ইং. পর্যন্ত দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে তিনি অবিচল নিষ্ঠা, ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে এই দায়িত্ব পালন করেছেন। এসময় জামিয়ার সুনাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে, এবং ছাত্রাবাস তাঁর নেতৃত্বে এক অনুপম দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এবং তাঁর দক্ষ ও সুশৃঙ্খল পরিচালনার ফলে ছাত্রাবাসে সুন্নাতি পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা সারা দেশের জন্য এক আদর্শ দারুল ইকামা হিসেবে গণ্য হতে থাকে।
সহকারী মুহতামিম
দায়িত্বশীলতা, আমানতদারী ও নিরলস নিষ্ঠার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এক সময় এই মহৎ ব্যক্তিত্ব জামিয়ার জ্যেষ্ঠ মুরব্বীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বিশেষ করে জামিয়ার তৎকালীন মুহতামিম হাকিমুল ইসলাম আল্লামা মুফতি আব্দুল হালিম বোখারী রহ. এর আস্থা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশস্বরূপ ২০১৯ সালে তাঁকে জামিয়ার মুঈনে মুহতামিম হিসেবে পদায়ন করা হয়। এ দায়িত্ব তাঁর জীবনকে নতুন মাত্রা দেয়। তিনি নিজের সব চিন্তা—চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেন জামিয়াকে। ব্যক্তিগত সুখ—স্বাচ্ছন্দ্যের তুলনায় জামিয়ার সেবা ও অগ্রগতি হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রথম ও প্রধান অঙ্গীকার।
নায়েবে মুহতামিম
পরবর্তী সময়ে, দীর্ঘ কর্মজীবনের নিষ্ঠা ও অবিচল আনুগত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ বোখারী সাহেব রহ. এর ইন্তেকালের পর ২০২২ তাঁকে সম্মানিত করা হয় নায়েবে মুহতামিম পদে। এ দায়িত্বও তিনি পালন করেন অতুলনীয় সততা, বিচক্ষণতা ও আত্মনিবেদনের সঙ্গে। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিফলিত হতো জামিয়ার কল্যাণের প্রতি সীমাহীন মমত্ব ও অকৃত্রিম ভালোবাসা। সত্যিই, তিনি ছিলেন জামিয়ার এক অবিচ্ছেদ্য অবলম্বন, যিনি ব্যক্তিগত জীবনকে বিসর্জন দিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে গেছেন।
মজলিশে এদারীর আহবায়ক
২৮ অক্টোবর ২০২৪ ইং তারিখে জামিয়ার অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় মুহতামিম পদ ত্যাগের পর, ২৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় জামিয়ার অতিথি কক্ষে শুরা সদস্য ও দেশের প্রখ্যাত আলেমদের উপস্থিতিতে একটি বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এশার নামাজের পর জামিয়ার কেন্দ্রীয় মসজিদে হাটহাজারী মাদরাসার মুহতামিম মুফতী খলিল আহমাদ কাসেমী শুরায় গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ ঘোষণা করেন। জামিয়া পরিচালনার জন্য ৫ সদস্যে একটি মজলিশে এদারী গঠন করেন। এবং এদারির আহবায়কের দায়িত্ব অর্পণ করা হয় মুফতী আবু তাহের কাসেমী নদভী সাহেবকে। তিনি দায়িত্ব গ্রহণে অনিচ্ছা প্রকাশ করলেও, মজলিশে শুরা তাকে দায়িত্ব পালন করার জন্য তাকিদ প্রদান করলে তিনি অবশেষে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
মুহতামিম
এর পর থেকে জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়া যেন এক গভীর ঝড়ঝঞ্ঝার মুখে পড়ে। শুরু হয় এক কঠিন অধ্যায়—যেখানে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা, চক্রান্ত ও নির্যাতনের অবিরাম ঝড় বয়ে যায়। জামিয়ার নিজ হাতে গড়া কিছু নাদান ও অন্ধ অনুসারী ষড়যন্ত্রের জালে জড়িয়ে শান্তিপূর্ণ পথচলা স্থবির করার চেষ্টা করে। বহিরাগত সন্ত্রাসী ও মাস্তানদের আক্রমণ, মিথ্যা মামলা, পুলিশি হয়রানি, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রতি অসদাচরণ—এসব ছিল সেই ষড়যন্ত্রের অংশ। জামিয়া বন্ধ করার কুটিল চক্রান্ত, মজলিশে শূরায় বাধা, পথঘাটে ছাত্র—শিক্ষকদের হয়রানি—এমন কোনো হীনচক্রান্ত নেই যা তারা করেনি। সরাসরি কিরিছ বাহিনী নিয়ে হামলা করে তাঁকে হত্যা চেষ্টা করা হয়। কিন্তু দয়াময়ের দয়া ও করণায় তিনি বেঁচে ফিরেছেন।
এই গাঢ় অন্ধকারের মাঝেও জ্বলজ্বলে আলো হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তিনি। নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে, তাদের সব ধরনের অপকর্ম, নির্যাতন ও বিভ্রান্তির মুখে দাঁড়িয়েছিলেন জামিয়ার রক্ষাকারী হিসেবে। তাঁর সাহসিকতা, নিষ্ঠা এবং দৃঢ় আত্মবিশ্বাস ছিল জামিয়ার নতুন সূর্যের প্রথম আলোর প্রতীক, যা সকলের মনোজগতে প্রেরণা জোগায়। তিনি একান্ত মুখলিস, মহৎপ্রাণ এবং আল্লাহভীরু রূহানী রাহবার, যাঁর নেতৃত্বে মিলিত হয়েছে আধ্যাত্মিকতা, আমানতদারী ও ইখলাস।
তার তাকওয়া, ফরহেজগারী এবং জামিয়ার খেদমতে নিজের জীবন উৎসর্গের ফলশ্রুতিতে ০৩/০৮/১৪৪৫ হিজরী, মুতাবেক ১৪/০২/২০২৪ ইংরেজী, বুধবার ঐতিহাসিক শুরার মাধ্যমে উপস্থিত সকলের সর্বসম্মতিক্রমে জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার নতুন মুহতামিম হিসেবে নিযুক্ত হন। দায়িত্বপ্রাপ্তির দিন তাঁর ডুকরে ডুকরে কান্নার দৃশ্য দেখে মনে হয়েছিল আসলে এ মহান দায়িত্বের জন্য তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্বাচিত ছিলেন।
তিনি কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনকারী নন; তিনি আকাবিরদের রেখে যাওয়া এক অমূল্য আমানতের নির্ভরযোগ্য বাহক, জামিয়ার ইহতেমামের মসনদে সমাসীন দীপ্তিমান উত্তরসূরী, যাঁর অস্তিত্বে মিশে আছে অতীতের গৌরব, বর্তমানের দায়িত্ব এবং ভবিষ্যতের দীপ্ত প্রতিশ্রুতি।
তাঁর অন্তর সুবাসিত তাকওয়া, দৃষ্টি প্রসারিত নববী নূরের দিকে, এবং চরণ চলেছে সেই মহাপুরুষদের পথ ধরে—যাঁরা দ্বীনের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন নিঃস্বার্থভাবে। ঝড়ঝঞ্ঝা, ষড়যন্ত্র ও হয়রানির মাঝেও তিনি হয়ে উঠেছেন এক অনন্য বাতিঘর। ঝড়ের মাঝে শান্তি, অন্ধকারে আলোর দিশারী—এই বীরত্ব, ত্যাগ ও পরিশ্রমের মুজাসসামে আজ জামিয়া বেঁচে আছে, বিকশিত হচ্ছে এবং আলোকিত করছে বিশ্ব দরবার।
আধ্যাত্মিক সম্পর্ক
আল্লামা আবু তাহের কাসেমী নদভী দা.বা. ছাত্রজীবন থেকেই আধ্যাত্মিক সাধনার সাথে যুক্ত। তিনি প্রথমে আশরাফ আলী থানভী (রহ.)—এর খলিফা মাওলানা আবরারুল হক হারদুয়ী (রহ.)—এর কাছে দীর্ঘ ২৫ বছর যাবত তাসাউফের শিক্ষা গ্রহণ করেন। দীর্ঘ দিন যাবত তাঁর সোহবত লাভ ধন্য হন। তাঁর ইন্তেকালের পর ফকিহুল মিল্লাত মুফতি আব্দুর রহমান (রহ.)—এর হাতে বাই‘আত গ্রহণ করেন। আজ তিনি শত শত আলেম—উলামার আধাত্মিক রাহবার। মানুষের ইসলাহের ফিকিরে সদা তৎপর জিন্দাদিল মুসলিহ।
শেষ রাতের দোয়া, জিকির ও চোখের পানি
একটি কথা প্রচলিত—পটিয়া মাদ্রাসা ছিল “চোখের পানির মাদ্রাসা”। সুলতান আহমদ নানুপুরী রহ. বলতেন, পটিয়ার জিকিরের আওয়াজ এত প্রবল ছিল যে ইন্দ্রপোল পর্যন্ত পৌঁছাত। জামিয়ার দ্বিতীয় মুহতামিম হাজী সাহেব হুজুরের কক্ষ থেকেও মধ্যরাতে ‘ইল্লাল্লাহ ইল্লাল্লাহ’ জিকির ধ্বনিত হতো।
হযরত বোয়ালভী রহ. ছিলেন এমন একজন, যিনি এশার পর শুয়ে শেষ রাতে তাহাজ্জুদ, দোয়া ও জিকিরে মশগুল থাকতেন। পটিয়ার প্রতিষ্ঠাতা মুফতি আজিজুল হক রহ.—এর মোনাজাত ছিল রূহানিয়াতের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মাওলানা হারুল ইসলামাবাদী রহ. বলতেন—“মাদ্রাসায় যদি তাহাজ্জুদ, জিকির ও দোয়া না থাকে তবে আল্লাহর রহমতও আসবে না।”
জামিয়ার দুর্দিনে যখন কোনো দ্বার খোলা ছিল না, তখন থেকে মুফতি আবু তাহের কাসেমী নদভী দা.বা. জামিয়ার অতিথিশালায় দোয়া ও জিকিরের হালকা বসিয়ে আকাবিরদের রূহানিয়াতের ধারা জীবন্ত করে দিয়েছেন। তাঁর সেই কান্নাভেজা রাত, দোয়া ও সংগ্রাম আজ পটিয়ার ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। তিনি প্রমাণ করেছেন—আল্লাহর সাথে সম্পর্কই মাদ্রাসার প্রকৃত শক্তি, আর তাহাজ্জুদ ও জিকিরের ধারা অটুট থাকলেই পটিয়ার রূহানিয়াত দীপ্তি ছড়িয়ে যাবে—ইনশাআল্লাহ।
হযরতের রচনাবলী
ইলম ও আমলে সমান পারদর্শী এ বিদ্বান কলমের জগতে—ও সক্রিয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ হলো—
১. দুরুসুল লুগাতুল আরবিয়া (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড)
২. আমার দেখা লন্ডন (ভ্রমণ কাহিনী)
৩. কওমি মাদরাসা: কী ও কেন?
৪. হাম কৌন হ্যায়? হমারি যিম্মাদারি কিয়া হ্যায়?
৫. তাযকিরায়ে—এ শাহ আলী আহমদ বোয়ালভী
৬.নিদাউল মানাবির ( মিম্বরে আহ্বান)
৭. তামরীনুল মিজান ওয়াল মুনশাইব